সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য : | বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | 12 বার পঠিত
‘নদী বাঁচাও, দেশ বাঁচাও, প্রকৃতি বাঁচাও’—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে নদী, পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে নদী ও প্রকৃতি রক্ষায় সামাজিক সংগঠন নোঙর বাংলাদেশ-এর জেলা শাখা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের হলরুমে আলোচনা সভা ও সাংগঠনিক কর্মশালার মধ্য দিয়ে কর্মসূচির শুরু হয়। পরে বিকেলে তিতাস নদীর পাড়ে বৃক্ষরোপণ এবং নৌকাযোগে নদী পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ সময় নদীর নাব্যতা সংকট, তীর দখল, নদীর পাড়ে বর্জ্য ফেলা ও পানিদূষণের বিভিন্ন চিত্র সরেজমিনে পরিদর্শন করেন নোঙর বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ ও পরিবেশকর্মীরা।
নোঙর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সভাপতি মো. মনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন নোঙর বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সুমন শামস। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, পরিবেশ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক নাজিম হোসেন শেখ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী রাতুল বনিক, পরিদর্শক মো. জসিম উদ্দিন এবং পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জাবেদ রহিম বিজন, সাধারণ সম্পাদক বাহারুল ইসলাম মোল্লা, নোঙর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল উদ্দিন, সহসভাপতি প্রফেসর মোশারফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিল্লাল, ঐক্যবদ্ধ সদর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আহ্বায়ক মো. আরিফ বিল্লাহ, বিডি ক্লিনের প্রতিনিধি লিটন দেবনাথ, হেল্প লাইন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিনিধি কিবরিয়া, মহিলা দল জেলা সাধারণ সম্পাদক শামীমা বাছির স্মৃতি, ডা. শারমীন সুলতানা টুনটুন, সাংবাদিক শেখ সহিদুল ইসলাম, মো. আরজু, ইব্রাহিম খান সাদাত ও আবুল হাসনাত অপুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন নোঙর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিল্লাল।
নদী রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন জোরদারের আহ্বান
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নোঙর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সুমন শামস বলেন, নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, নৌপথ এবং মানুষের জীবন-জীবিকা নিবিড়ভাবে জড়িত। নদী দখল ও দূষণের কারণে দেশের অনেক নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেন, নদী রক্ষায় শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে হবে না। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নদীর দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সুমন শামস আরও বলেন, নদী ও প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা একটি সংগঠনের একার দায়িত্ব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখন থেকেই নদী, খাল, জলাশয় ও সবুজ প্রকৃতি রক্ষায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নোঙর বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম বলেন, নদী ও প্রকৃতি রক্ষায় নোঙর বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। শুধু সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে নদীর বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, নদী দখল ও দূষণ বন্ধে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদীর তীরে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, বৃক্ষরোপণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে নদী রক্ষার আহ্বান
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জাবেদ রহিম বিজন বলেন, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদী দখল, দূষণ, অবৈধ স্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পরিবেশের ক্ষতির বিষয়গুলো নিয়মিত সংবাদে তুলে ধরার মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, নদী ও পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনে সাংবাদিকদের পাশাপাশি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। স্থানীয় নদীগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে এ ধরনের মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বাহারুল ইসলাম মোল্লা বলেন, নদী রক্ষার আন্দোলনে গণমাধ্যম সবসময় সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারে। নদীর বাস্তব চিত্র, দখল ও দূষণের ঘটনা গণমাধ্যমে তুলে ধরলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হয়। তিতাস নদীসহ জেলার নদী-জলাশয় রক্ষায় ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাংগঠনিক কর্মশালায় ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
আলোচনা সভা শেষে বিকেল ৩টা থেকে দ্বিতীয় অধিবেশনে সাংগঠনিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় নোঙর বাংলাদেশের সাংগঠনিক কার্যক্রম, সংগঠনের সংবিধান, সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং মাঠপর্যায়ে পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েও মতবিনিময় করেন নেতৃবৃন্দ। সংগঠনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিবেশ সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার এবং নদী, খাল, জলাশয় ও বৃক্ষ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তিতাস নদীর পাড়ে বৃক্ষরোপণ
দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে আসরের নামাজের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের তিতাস নদীর পাড়ের আনন্দবাজার ঘাটে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় নদীর তীরবর্তী এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন নোঙর বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ ও অংশগ্রহণকারীরা।
বক্তারা বলেন, নদীর তীর সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সবুজায়নের জন্য নদীর পাড়ে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ প্রয়োজন। শুধু চারা রোপণ নয়, রোপণ করা গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণেও স্থানীয় জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
নৌকাযোগে তিতাস নদী পর্যবেক্ষণ
বৃক্ষরোপণ শেষে নোঙর বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ ও অংশগ্রহণকারীরা নৌকাযোগে তিতাস নদীর বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় নদীর বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলা, তীর দখল, নাব্যতা সংকট ও পানিদূষণের চিত্র সরেজমিনে দেখা হয়।
নদী পর্যবেক্ষণকালে বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ও দখলের চিত্র দেখে পরিবেশকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, তিতাস নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি নদীর তীরে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ ও নদীদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
নোঙর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ জানান, তিতাসসহ জেলার বিভিন্ন নদী ও জলাশয় রক্ষায় ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ, নদী পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। নদী ও প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তারা।
দিনব্যাপী এ কর্মসূচিতে নোঙর বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
Posted ৪:৩৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
brahmanbaria2usa.com | Dulal Miah